Thursday, November 14, 2013

৬. ধর্মের কিছু বিস্মৃত ঘটনা: অজাচার


৬. ধর্মের কিছু বিস্মৃত ঘটনা: অজাচার


এই লেখায় আমার অল্প বিদ্যায়, ধর্মে ধর্মগ্রন্থে কিছু অজাচারের কথা বলি। প্রথমেই বলে রাখি জন্মসুত্রে আমি হিন্দু, কিন্তূ আমার বিশ্বাস হিন্দু কোনো ধর্ম নয়। আমি মানবতার ধর্মে বিশ্বাসী। তবু অজান্তে কারো ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দিয়ে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আর কোনো ভুল থাকলে সঠিক তথ্যপ্রমানসহ একটু শুধরে দেবেন। এই লেখার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই কোনো কামজ উত্তেজনা সৃষ্টি নয় বরং একটা অবিশ্বাস কে বিশ্বাস করা যে অজাচার ছাড়া এই পৃথিবী বা এই যে বিশাল মানবজাতি তৈরী কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না।

সনাতন বিশ্বাসে প্রমান করা যায় মুসলিম ধর্ম বা  খ্রিস্টধর্ম সনাতন হিন্দু ধর্ম থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এসেছে। আমি সেই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না, তবে একটু ধর্মগুলোর উৎপত্তি দেখে নেওয়া যাক। হিন্দু ধর্ম বা বিশ্বাসের সূচনা বা বৈদিক সভ্যতা ১০,০০০ (দশ হাজার) বছরের পুরনো (ঋগবেদের সময় অনুসারে); কেউ মনে করেন হিন্দুধর্মের সূচনা ,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, আবার অনেকেই মনে করেন হিন্দু কোনো ধর্ম নয়, একটি সভ্যতা মাত্র। আমি শেষোক্ত দলে পড়ি। এছাড়া ,০৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ আব্রাহাম প্রচারিত ইহুদীধর্ম; ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জরথুস্ট্রপন্থা; ৫৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাবীর প্রচারিত জৈনধর্ম; ৫৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গৌতম বুদ্ধ প্রচারিত বৌদ্ধধর্ম; ৫৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কনফিউশিয়াসের কনফিউশিয়ানিজম; ৩০ খ্রিস্টাব্দে যিশু খ্রীষ্ট প্রচারিত খ্রীষ্টধর্ম;  ৬১০ খ্রিস্টাব্দে হজরত মহম্মদ প্রচারিত ইসলাম বা মুসলিম ধর্ম; ষষ্ঠ শতাব্দের শিন্টো বা জাপানি ধর্ম; পঞ্চদশ শতাব্দীতে গুরু নানকের শিখধর্ম; ,৬৫০ নাগাদ দলাই লামার তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্ম; এবং ,৮৪৪ নাগাদ আবুল বাহা প্রচারিত মানবধর্ম - বাহাই।

হিন্দুবিশ্বাস যে আদি মানব বা প্রথম স্রষ্টা ছিলেন ব্রহ্মা। আদি তিনদেবতা হলেন - ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বর; কিন্তূ লক্ষনীয় বিষ্ণু মহেশ্বর বিভিন্নরূপে পূজিত হলেও কেরালা বা পুষ্করসহ দু-চারটি জায়গা বাদে ব্রহ্মার কোনো মন্দির নেই বা উনি এই ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করলেও, নিজে সেরকমভাবে কোথাও পূজিত হন না। কারণ অনেকগুলো, তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য ওনার অজাচারী স্বভাব। ব্রহ্মা স্বয়ম্ভূ - পদ্মফুল বা মতান্তরে জল থেকে জন্ম - একটি মাথা নিয়ে। নিজের দেহ থেকে উনি অন্য অনেক প্রাণীর সাথে এক অপরূপ সুন্দরী নারী সৃষ্টি করেন, যার নাম শতরূপা। শতরূপা অনেকসময় সাবিত্রী বা ব্রাহ্মি বা সরস্বতী বা গায়ত্রী নামেও পরিচিত। কিন্তূ এরপর গোল বাঁধলো, ব্রহ্মা নিজের সৃষ্ট কন্যার প্রেমে পড়ে গেলেন। শতরূপা লজ্জা পেয়ে যেদিকে লুকোতে যান, ব্রহ্মা সেইদিকে নিজের একটি করে মাথা তৈরী করেন। এভাবে উনি চারদিকে চারটি আর উপরে একটি - মোট পাঁচটি মাথা তৈরী করেন। দেবশ্রেষ্ঠ শিব এই সময় এগিয়ে এলে ব্রহ্মা শিব অপমান করে বসেন এবং পরিনামে শিবের তৃতীয় নয়নের তেজে উপড়দিকে মুখ করা মাথাটি পুড়ে যায়। সেই থেকে অজাচারী ব্রহ্মার পাঁচটি মাথা আর অজাচারের শাস্তি হিসেবে মর্ত্যলোকে পূজিত হন না।

হিন্দুবিশ্বাসের অন্য মতে সৃষ্টির আদিপুরুষ মনু - যার সন্তানদের সংস্কৃতে মানব বা মানুষ এবং ল্যাটিনে ম্যান বলে। মনুর সন্তানরাই ব্রাহ্মণ (যারা বেদচর্চা করতো), ক্ষত্রিয় (যারা দেশশাসন করতো), বৈশ্য (যারা ব্যবসা বানিজ্য করতো) এবং শুদ্র (যারা কায়িক পরিশ্রম করতো)। মনুর পুত্রসংখ্যা ষাটটিরও বেশী - এরমধ্যে অষ্টম সন্তান কন্যা - ইলা। স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে, একজন পুরুষ থেকে জাত সন্তানদের বংশরক্ষা হলো কি করে? তবে অনুমান করা ছাড়া অজাচারের কোনো সাক্ষ্য প্রমান নেই।

হিন্দুধর্মের দুটি অমূল্য সম্পদ আছে - যেগুলোকে কেউ বলেন পুরাণ, কেউ বলেন মহাকাব্য, কেউ বলেন ইতিহাস। সে দুটি হলো ত্রেতাযুগের ঘটনা নিয়ে লেখা রামায়ন এবং দ্বাপরযুগের মহাভারত। আমরা অমোঘবীর্য গুরু বৃহষ্পতির নিজের সন্তানসম্ভবা বৌদির সাথে বলপূর্বক মিলিত হওয়ার মতো ঘটনাগুলি বাদ দিয়ে চলে আসি কুরুবংশের কথায়। বিচিত্রবীর্য যখন টিউবারকোলেসিসে অকালে মারা যান, তখন বংশরক্ষার জন্য দুই সহোদরা পুত্রবধুর ঘরে শাশুড়ী সত্যবতী পাঠিয়ে দেন তাঁরই কুমারী অবস্থায় পরিত্যক্ত জারজ সন্তান কৃষ্ণদৈপায়ন ব্যাসদেবকে। অর্থাৎ নিয়োগপ্রথায় ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুর জন্ম অম্বিকা অম্বালিকার গর্ভে, তাঁদের সম্পর্কে ভাসুর ব্যাসদেব দ্বারা। তবে ব্যাসদেব বা পান্ডবদের জন্মগুলো অবৈধ কিনা সেই বিতর্কে না গেলেও বলা যায়, যাই হোক সেই সম্পর্কগুলো অজাচার নয়।

কোরানে বাইবেলের অনেক কাহিনীর উল্লেখ দেখা যায়।সেটাই স্বাভাবিক কারন ইসলাম দাবী করে ধারাবাহিকতার সূত্রে সে সর্বশেষ ধর্ম।আর তাই ইসলাম ধর্মের মধ্যে পূর্বোক্ত ধর্ম যেমন ইহুদি খৃষ্টান এগুলোর নানান কাহিনীর উল্লেখ থাকবে। তবে উল্লেখিত কাহিনীর মধ্যে বহু গরমিলও লক্ষ্যনীয়। দেখা যায়, বাইবেলে যেভাবে কাহিনীটা আছে কোরানে আছে ভিন্নরকম ভাবে। ইসলাম, ইহুদীধর্ম বা পরবর্তী খ্রিস্টধর্মে প্রথম মানুষ হিসেবে উল্ল্যেখ করা হয়েছে আদমকে। শুরুর দিকটা মোটামুটি একই রকম। ইহুদি, খ্রিস্ট বা ইসলামে আদম হলো প্রথম মানব - যাকে ঈশ্বর বা গড বা আল্লাহ খরখরে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন। তারপর তাঁর দেহে প্রাণ সঞ্চার করা হয়। আর ইভ (কোরানমতে হাওয়া) হলো প্রথম মানবী - যার সৃষ্টি আদমের পাঁজর থেকে। সৃষ্টির পর তাঁদের আবাস হয় বেহেশত বা স্বর্গ। তবে শয়তানের ঘটনা, নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেলা বা স্বর্গোদ্যান থেকে বহিষ্কারের ঘটনাগুলো পবিত্র কোরান, ওল্ড টেস্টামেন্ট বাইবেলে একে অপরের থেকে একটু আলাদা। ইসলাম মনে করে বহিষ্কারের পর আদমের জীবনকালেই নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেলার পাপের  প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গিয়েছিলো। আবার বাইবেলের মতে সেই পাপ মানুষজীবনে ধারাবাহিকভাবে প্রবাহমান হয়, যার প্রায়শ্চিত্ত হয় যিশু খ্রিস্টের আত্মবলিদান বা ক্রুশবিদ্ধকরণের মাধ্যমে। নোয়ার (নূহের) নৌকা বা পৃথিবীব্যাপী বিধ্বংসী বন্যা বা সুনামী এই তিন ধর্মগ্রন্থেই প্রায় একই রকমভাবে উল্লিখিত - যা মাইল যায় বিষ্ণুপুরাণ বা মনুসংহিতায় উল্লিখিত বিধ্বংসী বন্যা এবং বিষ্ণুর মৎস্য অবতার হয়ে সপ্তম মনুকে সপারিষদ রক্ষা করার সঙ্গে।

আমরা ফিরে আসি অজাচারে - সরাসরি বাইবেল ও কোরান প্রসঙ্গে। কোরানের মতে পৃথিবীতে আসার পর আদম ও হাওয়ার ৩৬১টি সন্তান হয় - এর মধ্যে একমাত্র শীস ব্যতীত সবাই জোড়ায়। হাদিসে আছে আদম ও হাওয়ার গর্ভে প্রতিবার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্ম নিত। তারা যখন বড় হতো, তখন ছেলে পূর্বে জন্ম নেওয়া মেয়ের সাথে এবং মেয়েকে পূর্বে জন্ম নেওয়া ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া হতো। যদিও তারা একই মায়ের সন্তান তবু প্রয়োজনের কারণে ও মানবজাতির বিকাশের জন্যে এটা বৈধ ছিল - অজাচার কিন্তূ অনাচার নয়। ইসলামে এখন আপন ভ্রাতা ভগ্নী ভিন্ন অন্য কোনো জ্ঞাতিভাই বা বোনের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ। হিন্দু বিবাহ আইনের বিশেষ বিবাহ আইনে কিছু বিধিনিষেধসহ জ্ঞাতিভাই বা বোনের মধ্যে বিবাহ সিদ্ধ।

বাইবেলের মতে আদম ও ইভের অনেক সন্তানের মধ্যে প্রথম দুই ছেলের নাম ছিল কেইন ও আবেল। কেইনের এক জমজ বোন ছিলো আর আবেলের সাথে জন্মায় আরো দুই বোন - মানে ত্রয়ী। আদমের প্রথম দুই মেয়ের নাম ছিলো আজুরা ও আওয়ান। কেইন ও আবেল দুজনেই নিজেদের জমজ বোনকে বিয়ে করে। কিন্তূ তৃতীয় বোনকে কে বিয়ে করবে এই নিয়ে ঝগড়ায় কেইন আবেলকে বধ করে। আদমের তৃতীয় পুত্র শেথ তার এক ভ্রাতুষ্পুত্রীকে বিয়ে করে। তওরাত আইনে (মোজেস প্রণীত) কাকা - ভাইঝি বিবাহ স্বীকৃত।

পরিশেষে পাঠকদের কাছে নিবেদন, সব তথ্য বিভিন্ন সুত্র থেকে যাচাই করে দেওয়া। তাই কোনো সংশোধন থাকলে সুত্রসহ উল্লেখ করবেন। মনে রাখা ভালো, মনু একটি উপাধিমাত্র এবং এক মনু ৩০,৬৭,২০,০০০ (ত্রিশ কোটি ষাটষট্টি লক্ষ কুড়ি হাজার) বছর বেঁচে থাকেন। আদমের উচ্চতা ছিলো ৩০ ফুট এবং বেঁচেছিলেন ৯৩০ বছর। নোয়া সেই বিধ্বংসী বন্যার পরেও ৩৫০ বছর বেঁচে, নিজের ৯৫০ বছর বয়সে মারা যান।

কাল অতো রাতে ঘুমের ঘোরে একটু গন্ডগোল হয়ে গেছে। আদমের তিন ছেলে আর দুই মেয়ে এক মতে, আবার ভিন্নমতে তিন মেয়ে দুই ছেলে। আর একটা কথা কথা ইভ (বা হাওয়া) আদমের পাঁজর থেকে তৈরী আবার আদমের স্ত্রী। তারমানে আদম নিজেই নিজের আত্মজাকে বিবাহ করেছিলো।

৫. ভারতীয় ইতিহাসের কিছু বিস্মৃত ঘটনা: বঙ্গে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী


৫. ভারতীয় ইতিহাসের কিছু বিস্মৃত ঘটনা: বঙ্গে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী

পঞ্চদশ শতাব্দীতে কবি বিপ্রদাস পিপিলাই মনসামঙ্গলে লিখে গেছেন 'গঙ্গা আর সরস্বতী/ যমুনা বিশাল অতি/ অধিষ্ঠান উমা মহেশ্বরী।' ১৬৬০ সালে ভূতাত্ত্বিক ভ্যান ডি ব্রুক ভারতের, বিশেষত অবিভক্ত বঙ্গদেশের অনেকগুলি নকশা এঁকে গেছেন। কালের স্রোতে তার থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্নসুত্র থেকে একদম শুরুর কথা যা পাওয়া যায় তা হোল জুরাসিক যুগে প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে যখন গণ্ডয়ানা অনেকগুলো টুকরোয় ভেঙ্গে যায়, তখন সৃষ্টি হয় গঙ্গা ও ব্ৰহ্মপুত্ৰের। ধীরে ধীরে পলি জমে সৃষ্টি হয় অন্তর্বর্তী বদ্বীপের এবং আরও পরে গঠন হয় বঙ্গোপসাগরের তটরেখার। পৌরাণিক মতে গঙ্গা নদী নয় একটি খাল। এটির খনন করেছিলেন কোশালার (অধুনা উত্তরপ্রদেশের অবধ) সাগর রাজার ছেলে ভগীরথ। এই বিতর্কের মধ্যে এখন না গিয়ে দেখে নেওয়া যাক গত পাঁচশ বছরে এই গুরুত্বপূর্ণ নদী ও তার শাখানদীগুলির আদি পথ এবং পরবর্তী গতি পরিবর্তন।  

হুগলী জেলার সপ্তগ্রাম ও ত্রিবেণী ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক দুদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তগ্রাম ছিল একটি প্রধান নদীবন্দর, প্রধান শহর এবং প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় সময়ে কখনও কখনও দক্ষিণ বাংলার রাজধানী। ত্রিবেণী হোল গঙ্গা ও তার দুই প্রধান শাখানদী যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গমস্থল। ষোড়শ শতকেও ত্রিবেণী থেকে দক্ষিণ পশ্চিম দিক ধরে সপ্তগ্রাম হয়ে বয়ে চলত সরস্বতী নদী। যমুনা বইত দক্ষিণ পূর্ব দিক ধরে। আর মূলধারা ভাগীরথী বা হুগলী নাম নিয়ে বইত মাঝামাঝি। খোঁজ করলে ত্রিবেণী (Tribeni) নামটিকে অনেকগুলি জায়গায় পাওয়া যাবে। যেমন নেপালে দুটি ত্রিবেণী (Tribeni) আছে একটি ধবলগিরি অঞ্চলে পারবাত জেলায়, অন্যটি রাপ্তি অঞ্চলে সাল্যান জেলায়। ভারতেও দুটি ত্রিবেণী আছে একটি এই হুগলীর, অন্যটি ঘটনাচক্রে এলাহাবাদের কাছে গঙ্গা ও উত্তর ভারতের যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গমস্থলের নামও ত্রিবেণী (Triveni) সঙ্গম।

সপ্তগ্রাম তৈরী সাতখানি গ্রাম নিয়ে বাঁশবেড়িয়া, কৃষ্টপুর, বাসুদেবপুর, নিত্যানন্দপুর, শিবপুর, সাম্বাচোরা ও বলদঘাটি। সপ্তগ্রাম ও ত্রিবেণী ঘিরে একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে। কন্নৌজের রাজা প্রিয়বান্তার সাত পুত্র ছিল অগ্নিত্র, মেধাতিথি, বাপুষ্মান, জ্যোতিষ্মান, দ্যুতিষ্মান, সবান এবং ভাব্য। এঁরা রাজকীয় জীবনযাত্রা ও ভোগবিলাসে বিরক্ত হয়ে বেড়িয়ে পরেন এক নতুন জায়গার খোঁজে যেখানে ওঁরা ধ্যানযোগ করতে পারেন। ঘুরতে ঘুরতে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গমস্থলে এসে জায়গাটি এতো পছন্দ হয়ে যায় যে তপস্বীর জীবনযাপন করার জন্যে তাঁরা সাতখানি গ্রাম স্থাপন করেন। এই সপ্তগ্রামের অবস্থান বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলী জেলার মুখ্য শহর ও রেল জংশন ব্যান্ডেল থেকে মাত্র ৪ কিমি দুরত্বে। যদিও উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে ভারতে রেল বিপ্লব ঘটেনি তখন এখানে কয়েকটি মাত্র কুঁড়ে ঘর ছিল। কারণ এটি যে সরস্বতী নদীর তীরবর্তী বন্দর ছিল সেই নদীটির কালের গর্ভে মজে যাওয়া এবং জব চার্নকের হাত ধরে কলকাতা বন্দরের শ্রীবৃদ্ধি।

সরস্বতীর (Saraswati) প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় মনসামঙ্গল কাব্যে সংস্কৃত আর বাংলা বানান এক হলেও এটি ঋগবেদে উল্লিখিত উত্তর ভারতের সরস্বতী (Sarasvati) নদী নয়। মনসামঙ্গল প্রথম লিখেছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কানা হরিদত্ত যেটি খুঁজে পাওয়া যায় নি। এরপরে ১৪৮৪-৮৫ সালে নতুনকরে মনসামঙ্গল লেখেন বিজয়গুপ্ত ও পুরুষোত্তম নাম দেন পদ্মপুরান। একই নামে পরে এটি লেখেন নারায়নদেব। ১৪৯৫-৯৬ সালে বিপ্রদাস পিপিলাই লেখেন মনসাবিজয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে আরও কিছু কবি মনসামঙ্গল রচনা করেছিলেন যেমন কেতকাদাস ক্ষমানন্দ, জগজীবন ঘোষাল, জীবনকৃষ্ণ মিত্র প্রমুখ।

মনসামঙ্গল অনুসারে চাঁদ সওদাগর ছিলেন অধুনা আসামের কামরূপ জেলার ছয়গাও তথা তৎকালীন চম্পক নগরের প্রভাবশালী বণিক। ছয়গাও (ছয়গাঁ) ও সপ্তগ্রাম (সাতগাঁ)-এর মাঝামাঝি ব্ৰহ্মপুত্ৰের তীরবর্তী জনপদ ছিল অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বগুড়া যেখানে বেহুলা ও লখিন্দরের লোহার বাসরের প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এই রচনাটি মনসামঙ্গলের উপর নয় কিন্তু তথ্যগুলি উল্ল্যেখ করা হল যাতে তখন নদীমাতৃক বঙ্গদেশের বানিজ্য পথগুলির একটা ধারনা করা যায়। পরিশেষে চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যপোতের সাগরযাত্রার পথটি ছিল সপ্তগ্রাম থেকে উজানে ত্রিবেণী সঙ্গম। সেখান থেকে চিৎপুর সালকিয়া - বেতড় (অধুনা শিবপুর ব্যাতাইতলা, যা গার্ডেনরিচের ঠিক উল্টোদিকে) কালিঘাট চুরাঘাট বারুইপুর ছাত্রভোগ  - বদ্রিকুণ্ড হাথিয়াগড় চৌমুখী শতমুখী সাগর সঙ্গম (অধুনা বোড়াল, নরেন্দ্রপুর, কোদালিয়া, মহিনগর, জয়নগর, লক্ষ্মীকান্তপুর, নামখানা)।

পাঠককে অনুরোধ করবো তৎকালীন ভাগীরথী বরাবর যাত্রাপথটি খেয়াল করতে। তখন গঙ্গা বা ভগীরথীর অভিমুখ ছিল বেতড় থেকে কালীঘাটের দিকে। এখন যেটি শিবপুর থেকে সাঁকরাইল, বজবজ, উলুবেড়িয়া, ফলতা, নুরপুর (রূপনারায়নের সঙ্গম), ডায়মন্ড হারবার, কুলপি, হলদিয়া, নয়াচর, কাকদ্বীপ হয়ে সাগরে গিয়ে পড়েছে। সরস্বতী নদী ত্রিবেণী থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমদিকে ভাগীরথীর সমান্তরাল ভাবে বইত আন্দুল - সাঁকরাইল হয়ে অধুনা গঙ্গার পথ মানে বজবজ, উলুবেড়িয়া হয়ে। দ্বাদশ শতকের শুরুর দিকে পশ্চিমে আন্দুল থেকে বেতড় এসে সরস্বতী একটি লুপ তৈরী করে আবার দক্ষিণপূর্ব দিকে বইত। বিশ্বাস করা হয় সরস্বতী অধুনা রূপনারায়নের খাত বরাবর বয়ে মোহনায় পড়ত তাম্রলিপ্ত (অধুনা তমলুক) হয়ে। তখন সরস্বতীর উপনদী ছিল রূপনারায়ন, দামোদরসহ অনেক ছোট নদনদী। বলাই বাহুল্য তাম্রলিপ্ত আগে একটি সমৃদ্ধ সমুদ্রবন্দর ছিল। সরস্বতীর একটি মজে যাওয়া শাখা আন্দুলে প্রভু জগৎবন্ধু কলেজের ডানপাশ হয়ে এখনও বইছে। 

সপ্তম শতাব্দী থেকে ধীরে ধীরে সরস্বতীর উৎপত্তিস্থলে পলি জমতে শুরু করে এবং ধীরেধীরে ষোড়শ শতক নাগাদ সরস্বতী প্রায় শুকিয়ে যায়। এরফলে সরস্বতীর জল ভাগীরথী হয়ে সাঁকরাইল থেকে সরস্বতীর নিম্নভাগ দিয়ে বইতে শুরু করে। অনেকে মনে করেন সরস্বতীর উপড়ভাগ শুকিয়ে যাবার ফলে নবাব আলীবর্দি খাঁ কৃত্রিমভাবে বেতড় থেকে সাঁকরাইল পর্যন্ত্য জুড়ে দেন যাতে বনিকদের নৌবহরগুলি সহজে সাগরে যেতে পারে। অর্থাৎ অধুনা গঙ্গা বেতড় পর্যন্ত্য ভাগীরথীর এবং জুড়ে দেওয়া অংশ ধরে সাঁকরাইল থেকে সরস্বতীর খাত ধরে বইছে। এর ফলে ভাগীরথীর আদি পরিত্যক্ত ধারাটিও শুকিয়ে যায় যেটি আমরা আদিগঙ্গা বলে জানি। অন্যমতে সরস্বতী থেকে আদিগঙ্গার মধ্যে একটি জোয়ারের খাড়ি ছিল। ওলন্দাজ নাবিকরা সাগর অভিমুখী বানিজ্যতরী যাতায়াতের জন্যে এই অংশটি গভীর করে খনন করে।

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে আদিগঙ্গা গোবিন্দপুর খাড়ি বলে পরিচিত ছিল যা ছিল গোবিন্দপুর গ্রামের দক্ষিণ সীমানা। ১৭২০-র দশকে এডওয়ার্ড স্যুরমান এটির সংস্কার করেন। তাই কিছুদিন আদিগঙ্গার নাম হয় স্যুরমান নালা। ১৭৭৩ সালে উইলিয়াম টলি এটি আরও গভীর করেন ও সার্কুলার ক্যানালের সাথে জুড়ে দেন - নতুন নাম হয় টলি নালা। ১৭৭৫ সালে টলি এটিকে বিদ্যাধরী নদীর সাথে জুড়ে দেন। এটি তখন নাব্য থাকলেও ক্রমাগত অবহেলা ও শহরান্নোয়নের কুফল হিসেবে আস্তে আস্তে মজে যায় এবং একটি নিকাশিনালার চেহারা নেয়। গার্ডেনরিচ থেকে খিদিরপুর হয়ে আলিপুর চিড়িয়াখানার পাশ দিয়ে কালীঘাট, সিরিটি, টলিগঞ্জ, আজাদগড়, রাণীকুঠি, নেতাজীনগর, বাঁশদ্রোণী, রথতলা (অধুনা বৈষ্ণবঘাটা), গড়িয়া, বোড়াল, মহামায়াতলা, নরেন্দ্রপুর, রাজপুর, হরিনাভি, কোদালিয়া, চাঙ্গারিপোতা (অধুনা সুভাষগ্রাম), অতিসারা গ্রাম (অধুনা মহিনগর ও বারুইপুর), জয়নগর ও মজিলপুর হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণ হবার সময় টলিগঞ্জ থেকে গড়িয়া অংশ আদিগঙ্গার উপর দিয়ে গেছে। আদিগঙ্গার সংস্কারের অনেক পরিকল্পনা নেওয়া হলেও পরিবেশবিদদের মতে মেট্রোর সম্প্রসারণ আদিগঙ্গার শেষ ত্বরান্বিত করবে।

পরিশেষে আসা যাক যমুনার (Jamuna) কথায়। বলাই বাহুল্য এটি উত্তর ভারতের যমুনা (Yamuna) বা বাংলাদেশে একই নামে অন্যান্য নদীর থেকে আলদা। শুরুতে ত্রিবেণী থেকে গঙ্গার অন্যতম শাখানদী হিসেবে যমুনা বইত দক্ষিণ পূর্ব দিক ধরে। যদিও সময়ের সঙ্গে হুগলী নদীর সাথে যমুনার যোগসূত্রটি শুকিয়ে গিয়ে এটি এখন একটি স্বতন্ত্র নদী হিসেবে পরিচিত যার উৎপত্তি নদীয়া জেলার দক্ষিনে হরিণঘাটা মাদার ডেয়ারি কেন্দ্র এবং সঙ্গম উত্তর চব্বিশ পরগনার চারঘাটের কাছে বাংলাদেশের অন্যতম নদী ইছামতি। মুলনদীটি ত্রিবেণীর গঙ্গা থেকে উৎপন্ন হয়ে অধুনা উৎপত্তি হরিণঘাটা থেকে আঁকাবাঁকা পথ ও অনেকগুলি তীক্ষ্ণ মোড় ঘুরে নাগারুখ্রা, গাইঘাটা, গোবরডাঙ্গা, মছলন্দপুর হয়ে চারঘাটে ইছামতিতে পড়ত। এই নদীর তীরে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে যেমন ইন্ডিয়ান ইন্সিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশান অ্যান্ড রিসার্চ, গাইঘাটা শ্মশান, গোবরডাঙ্গা গ্রামীণ হাসপাতাল, গোবরডাঙ্গা শিশু হাসপাতাল, গোবরডাঙ্গা রাজবাড়ী ইত্যাদি।

গুরুত্বপূর্ণ নদী হলেও এখন আদিগঙ্গার মতো যমুনাও প্রচণ্ড দূষিত একটি নদী। সময়ের সাথে দিক পরিবর্তন করায় যমুনার অনেকগুলি অশ্মক্ষুরাকৃতি হ্রদ তৈরী হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোল গোবরডাঙ্গার কঙ্কনা ঝিল। কঙ্কনা ঝিলকে বেষ্টন করে আছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থান যেমন গোবরডাঙ্গা জমিদার বাড়ী, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, বিখ্যাত চণ্ডীমন্দির যেখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে প্রথম বিধবা বিবাহ হয়েছিলো। এছাড়াও এটি মৎস্যশিকার ও নৌকাবিহারের সুবিধাযুক্ত সর্ষেখেত ও নারিকেল বাগানে ঘেরা একটি সম্ভবনাময় শস্যশ্যামলা পর্যটনকেন্দ্র। এই নদীগুলির সংস্কার ও পর্যটনের প্রসারের জন্যে সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি দরকার জনসচেতনতা।