Tuesday, April 2, 2013

৫. কলেজের ইতিহাস ঘেঁটে

- ৫. কলেজের ইতিহাস ঘেঁটে
জ হুগলী নদীর ধারে প্রায় পাঁচ লক্ষ বর্গমিটার জুড়ে দাড়িয়ে আছে যে কলেজ তার ইতিহাসটা একটু ঘেঁটে দেখা যাক। এটাকে বলা হয় অবিভক্ত ভারতবর্ষের তথা এশিয়ার দ্বিতীয় প্রাচীন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ যার শুরু ১৮৫৬ সালে এবং প্রাচীনতম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হল রুড়কী (যেটা এখন আই আই টি, রুড়কী) যার প্রতিষ্ঠা ১৮৪৭ সালে। এখানে একটু কিন্তূ আছে।
১৭৯৪ সালে চেন্নাই-এর অদূরে গিঁডিতে একটা সার্ভে স্কুল চালু হয়, যা ইউরোপের বাইরে প্রথম কোনো আধুনিক টেকনিকাল স্কুল। ১৮৫৮ সালে এই স্কুলের নাম হয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল, গিঁডি এবং ১৮৬১ থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং চালু হবার পর নাম হয় গিঁডি কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং, যেটা আজ আন্না ইউনিভার্সিটির চারটি শুরুর কলেজের একটি। দেখতে গেলে এটাই ইউরোপের বাইরে প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এরপর ১৮৪৭ সালে রুড়কী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ; ১৮৫৪ সালে পুণে গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ১৮৫৬ সালে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চালু হয়। সেই হিসাবে এটা হয়ত চতুর্থ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। কিন্তূ প্রথম স্নাতক যন্ত্রবিদ (ইঞ্জিনিয়ার) পাশ করে বেরোনোর হিসেবে দেখতে গেলে প্রথম রুড়কী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (১৮৫১) এবং তারপরেই আমাদের কলেজ (১৮৬৪), তারপর গিঁডি। আর পুণের প্রথম স্নাতক যন্ত্রবিদ পাশ করে ১৯১২ সালে। এছাড়াও একটা জনশ্রুতি আছে যে ভারতবর্ষের প্রথম স্নাতক (Bachelor of Engineering) এই কলেজ থেকেই পাশ করে ১৮৬৪ সালে। রুড়কীতে তখনো ভারতীয়দের জন্যে ডিপ্লোমা পাঠক্রম চালু ছিল।
রুড়কী আর শিবপুর দুটো কলেজেই চালু হয় পূর্ত বিভাগের জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রবিদ তৈরি করার জন্যে। কিন্তূ রুড়কীতে প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস ছিল শুধু ইউরোপিয়ানদের জন্যেই। কিন্তূ শিবপুরে শুরু থেকেই ইউরোপিয়ানদের সঙ্গে ভারতীয়রাও ভর্তি হতে পারত। ১৮৪৩ নাগাদ বেঙ্গল শিক্ষাপর্ষদ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস শুরু করার উদ্যোগ নিয়ে তদানীন্তন হিন্দু কলেজ যা এখন প্রেসিডেন্সি কলেজ, সেখানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যাপকের পদ তৈরি করে। পরে লর্ড ডালহৌসির প্রস্তাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ মঞ্জুর করে। তখন প্রধানত  ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংই বলা হতো কেন সেটা চাকরি জীবনে এসে আমার এক বসের কাছে জেনেছি, যিনি নিজে খড়গপুরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাপারটা প্রথম আসে সৈন্যবাহিনীতে; কারণ তারাই রাস্তা, ব্রিজ, ঘর, ব্যারাক, রেললাইন এমনকি ডাক, তার এসব তৈরি বা ব্যবহার করত। এখনো অনেক ব্রিজ আছে যেগুলো সৈন্যবাহিনীরই তৈরি; অনেক ড্রেন , রেল বা টেলিগ্রাফ নেটওয়ার্ক আছে যেগুলো সৈন্যবাহিনীরই তৈরি এবং ওরাই দেখাশোনা করে। পরে আস্তে আস্তে সাধারণ নাগরিক জীবনের প্রয়োজনে দরকার অনুভব হলো। তাই দুধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হতো, একটা সমরবিদ্যা বা মিলিটারী ইঞ্জিনিয়ারিং; অন্যটা বাস্তুবিদ্যা বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। অবশেষে ১৮৫৬ সালের ২৪শে নভেম্বর থেকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ৯, ১০ আর ১১ নম্বর ঘরে শুরু হলো কলকাতা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (Calcutta Civil Engineering College)। প্রথম অধ্যক্ষ (প্রিন্সিপাল) হলেন লেফটেনান্ট ই সি এস উইলিয়ামস সাহেব। খুব শীঘ্রই ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলো আর এই কলেজ সেখানে একটা আলাদা বিভাগ হিসাবে (Faculty of Civil Engineering) অন্তর্ভুক্ত হলো।
শুরু হলো এক নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন যন্ত্রবিদ তৈরি করার উদ্দেশ্যে। ১৮৫৮ সালে প্রথম সার্ভে ক্যাম্প হয় রানিগঞ্জে। প্রথম সার্ভে কাম্পের এক হিসেব পাওয়া যায়, যাতে দেখা গেছে দুজন সহকারীর মাহিনা ছিল ৬ টাকা করে মোট ১২ টাকা। আর ১২ জন খালাসি নিযুক্ত হয়েছিল যাদের মাসমাহিনা ছিল ৫ টাকা করে। ১৮৬০ সালে চালু হয় ডিপ্লোমা  পর্যায় L. C. E. (Degree of Licentiate in Civil Engineering) যা পরে ১৮৮৪ সাল থেকে হয় L. E. (License in Engineering) যা ১৯০৬ সাল থেকে পুরোপুরি উঠে যায়। প্রথম L. C. E. তাত্ত্বিক পরীক্ষা (Theoretical Examination) হয় ১৮৬১ সালে। উর্তীন্ন হন এইচ এম আডেমস সাহেব এবং সর্বশ্রী মথুরা নাথ চ্যাটার্জি, বৈকুন্ঠ নাথ দে, যাদব চন্দ্র দে, ওমেশ চন্দ্র ঘোষ ও দীনানাথ সেন মহাশয়রা।
১৮৬৪ সালে প্রথম Bachelor of Civil Engineering (B. C. E.) পরীক্ষা চালু  হয় যা ১৮৮৪ থেকে পরিবর্তন হয়ে হয় B E (Bachelor of Engineering)। সর্বশ্রী রাজকৃষ্ণ ব্যানার্জি, সাতকড়ি চ্যাটার্জি, অম্বিকাচরণ চৌধুরী, কেদারনাথ দাস ও রাজকৃষ্ণ কুমার সেই বছর স্নাতক হন। ১৮৭৮ সালের এক সুপারিশে পরের বছর সরকার বাহাদুর সিদ্ধান্ত নেয় ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস এক নতুন জায়গায় নিয়ে যাবার। সেইমতো ১৮৮০ সালের ৫ই এপ্রিল এই কলেজ শিবপুরে তৎকালীন বিশপ কলেজের জায়গায় স্থানান্তরিত হয় আর নতুন নাম হয় গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শিবপুর (Government Engineering College, Shibpore) আর নতুন অধ্যক্ষ হন এস এফ ডাউনিং, যার নামে ১৮৮৬ সালে তৈরি হয় এক লক্ষ উনসত্তর হাজার তিনশো তেষট্টি টাকা ব্যায়ে  ডাউনিং হল । এই বছর থেকেই প্রথম অতিথি অধ্যাপকের চালু হয় মিঃ ডেজৌক্ষের হাত ধরে।  বিশপ কলেজের একটা উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো যে, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন মুখার্জী এখানে অধ্যাপনা করতেন আর মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই কলেজের ছাত্র ছিলেন।
১৮৮১ সালের ২৫শে এপ্রিল হয়েছিল এই কলেজের প্রথম ছাত্র ধর্মঘট আর এই বছরের শেষের দিকে কলেজের ভার পূর্ত দপ্তরের হাত থেকে বদল হয়ে যায় শিক্ষা দপ্তরের হাতে।  ১৮৮৭ সালে ডাউনিং হলের কাজ সম্পূর্ণ হয় যা এই কলেজের প্রথম ছাত্রাবাস আর এই বছর থেকেই কলেজের নাম বদলে হয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শিবপুর (Civil Engineering College, Shibpore) আর ১৮৮৯ সাল থেকে  বেশ কিছু  বদল হয়। সেই  বছর থেকেই সব ছাত্রের আবশ্যিক হয় ছাত্রাবাসে থাকা, ডাউনিং হলের মধ্যভাগের একটা অংশ নিয়ে শুরু হয় একটা হসপিটাল আর পূর্ত দপ্তরের উচ্চ আধিকারিকদের পদগুলো সংরক্ষিত হয় শুধুমাত্র এই কলেজের স্নাতকদের জন্যে।
১৮৯২ সালে অধক্ষ্য হন জে এস স্লেটার, যার নাম স্লেটার হল। বাস্তুবিদ্যা বা সিভিলের পর এই কলেজের দ্বিতীয় বিভাগ শুরু হয় কৃষি বা এগ্রিকালচার ১৮৯৮ সালে কিন্তূ বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যায় ১৯০৯ সালে। ১৯০৪ সালে অধ্যক্ষ হন বি হিটন, যার নামে ইউরোপিয়ান ছাত্রদের জন্যে তৈরি তৃতীয় ছাত্রাবাস হিটন হল, যা পরে কয়েক বৎসর চালু ছিল সম্পূর্ণ মুসলিম ছাত্রাবাস হিসেবে। যদিও এর আগে ডাউনিং হলের এক অংশ মুসলিম ছাত্রদের জন্যে আর অন্য দুই অংশ হিন্দু ছাত্রদের জন্যে সংরক্ষিত ছিল। আজকের ওভালের পাশের সেই লাল বাড়ি অর্থাৎ হিটন হল এখন কলেজ অধ্যক্ষের বাসস্থান। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের উত্তাপে ইংরেজ সরকার উদ্যোগ নেয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে স্থানান্তরিত করার এবং নতুন জায়গার প্রস্তাব হয় রাঁচি। ১৯১২ সালে তৈরি হয় আধুনিক গ্রন্থাগার, ১৯১৬ সালে হয় ছাত্রাবাসের মেস পদ্ধতির উন্নতির দাবিতে প্রথম অনশন ধর্মঘট। ১৯১৮ সালে রাঁচি স্থানান্তরন প্রচেষ্টা রদ হয়। সরকারী আদেশনামায় কলেজ শিবপুরেই থেকে যায়। ১৯২২ সালে অধক্ষ্য হয়ে আসেন টি এইচ রিচার্ডসন, ১৯২৮ সালে এ ম্যাকডোনাল্ড, ১৯৩৬ সালে আর উল্ফেন্ডেন, ১৯৩৯ সালে প্রথম ভারতীয় অধক্ষ্য ডাঃ এ এইচ পান্ডিয়া, ১৯৪৫ সালে এন এন সেন, ১৯৪৯ সালে ডাঃ এস আর সেনগুপ্ত, ১৯৫৬ সালে এ সি রায় ইত্যাদি।
১৯০৬ সালে শুরু হয় ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বপ্রথম খননবিদ্যা বা মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং যা ১৯২৯ সালে বন্ধ হয়ে গেলেও, পরে ১৯৫৬ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে নতুন কলেবরে মাইনিং ও জিওলজি বিভাগ হিসেবে পরিচিত হয়। বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রিকাল বিভাগের যাত্রা শুরু ১৯১২ সালে, যদিও এই বিভাগের প্রথম স্নাতক পাশ করে ১৯৩৬ সালে। যন্ত্রবিদ্যা বা মেকানিকাল বিভাগের শুরু ১৯২১ সালে ডিপ্লোমা পাঠক্রম দিয়ে এবং প্রথম স্নাতক তৈরি হয় ১৯৩০ সালে। ১৯৩৯ সালে দেশের দ্বিতীয় ধাতুবিদ্যা বা মেটালার্জি বিভাগ শুরু হয়। এর মাঝে ১২ই ফেব্রুয়ারী, ১৯২০ থেকে কলেজের নাম কিছুদিনের জন্যে পরিবর্তন হয়ে হয় বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শিবপুর (Bengal Engineering College, Shibpore)। ২৪শে মার্চ, ১৯২১ থেকে শিবপুর শব্দটি উঠে গিয়ে হয় বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (Bengal Engineering College)।
স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সালে শুরু হয় আর্কিটেকচার, টাউন ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগ শুরু হয় একসাথে স্নাতক ও ডিপ্লোমা পাঠক্রম দিয়ে। ১৯৪৯ সালে নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ হয় এবং সমস্ত বিভাগ এখানে স্থানান্তরিত হয় যা এখনকার প্রধান কলেজ বিল্ডিং। ১৯৫০-এ জয়যাত্রা শুরু হয় শিবপুর পলিটেকনিকের। ১৯৫৪ সালে সিভিল, মেকানিকাল, ইলেকট্রিকাল এবং মেটালার্জির স্নাতকোত্তর পাঠক্রম শুরু হয়, ভারতবর্ষের মধ্যে প্রথম। ১৯৬৮ সালে বিদ্যুতিন সংক্রান্ত পদার্থবিদ্যা এবং দূরসঞ্চার বিভাগ বা ইলেক্ট্রনিস এবং টেলিকমিউনিকেশন; ১৯৮২ সালে কম্পিউটার সায়েন্স  এন্ড টেকনোলজি; ২০০০ সালে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ্যা বা ইনফরমেশন টেকনোলজি এবং সর্বশেষ ২০১০ সালে মহাকাশ যন্ত্রবিজ্ঞান বা এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগগুলি শুরু হয়।
এই সব কারিগরী বিভাগ ছাড়াও বেশ কয়েকটি বিভাগে স্নাতক, স্নাতকোত্তর পাঠক্রম ও গবেষনার কাজ চলে, যেমন পদার্থ্যবিদ্যা (Physics), রসায়ন (Chemistry), গণিত (Mathematics), ভূবিজ্ঞান (Earth Science) এবং মানব সম্পদ পরিচালন (Human Resource Management)। এছাড়াও চালু আছে অনেকগুলো স্কুল যেমন পূরবী দাস স্কুল অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি (PDSIT); স্কুল অফ মেটেরিয়াল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (SMSE); স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স (SMS); স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট কমিউনিটি সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি (SCST); স্কুল অফ ডিসাষ্টার মিটিগেশান ইঞ্জিনিয়ারিং (SDME); স্কুল অফ  ইকোলজি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার এন্ড হিউমান সেটেলমেন্ট ম্যানেজমেন্ট (SEIHSM); স্কুল অফ মেকাট্রনিক্স এন্ড রোবোটিক্স  (SMR); স্কুল অফ সেফটি এন্ড ওকুপেশনাল হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং (SSOHE) এবং স্কুল অফ VLSI Technology (SVLSIT)।
১৯৯২ সালে এই কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ডিমড ইউনিভারসিটি বা স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের (Bengal Engineering College – Deemed University) শিরোপা পায় আর ২০০৫ সালে আর এক ধাপ উঠে পরিচিত হয় আজকের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড সায়েন্স  ইউনিভার্সিটি (Bengal Engineering and Science University) নাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। এই মুহুর্তে এটি  জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কেন্দ্র সরকারী অনুমোদন লাভ করেছে এবং ২০১৩ সালে নতুন নামকরণ হবার কথা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি – Indian Institute of Engineering Science and Technology (IIEST)।

৪. বাঁধা গরু ছাড়া পেল

- . বাঁধা গরু ছাড়া পেল 

Ragging পিরিয়ড শেষ হতো একটা দারুন ভোজ দিয়ে, যেটাকে Grand Feast বলা হতো  সাধারন মিল যেটা হত  সেটাকে Mid Day Meal বলা যেতে পারে। মাঝে মাঝে একটু ভালো মেনু হতো যেটাকে বলা হতো I.D. (Improved Diet) মাসে এক কি দুবার। আর বেশ খাসা হতো Grand Feast বছরে এক কি দুবার সাধারনত সেমেস্টারের ফাইনাল পরীক্ষার পর মেস বন্ধ হবার সময়। এই Grand Feast-টার সময় থেকেই অদ্ভুত পরিবর্তন হত। আমরা হীন মুরগি থেকে ফার্স্ট ইয়ারের মর্যাদা পেতাম, সিনিয়ার দাদারা হঠাত করে বাঘ থেকে বন্ধু হয়ে যেত। যারা এতদিন জান বার করে দিত, তারাই দরকারে জান দিয়ে দিত। এতদিন সিনিয়ার মানেই ছিল - দাদা, স্যার। যারা সেকেন্ড ইয়ার তারা প্রায় সবাই বলে দিত এরপর থেকে নাম ধরে ডাকতে। আর হাঁ, হঠাত জানতে পারতাম হাঁদা আসলে কৃষ্ণেন্দু পাল, ল্যামি আসলে শঙ্খকর ভৌমিক, রমেন আসলে সুমিত। আমাদের সুযোগ হতো এরপর প্রাণ খুলে সিনিয়ারদের সামনেই ধুমপানের এবং আস্তে আস্তে একটু মাকালির প্রসাদ হিসেবে কারণ সুধা পানের অথবা শিবের প্রসাদের কলকে সেবনের।

এরপর আমরাও বাঁধা গরু ছাড়া পেতাম। অন্য হোস্টেলে নিজেদের ডিপার্টমেন্টের বা শহরের ছেলেদের সাথে গিয়ে বন্ধুত্ব পাতানোর, একা ঘুরে বেড়ানোর, লর্ডসের মাঠে শুয়ে আকাশের তারাদের দিকে মুখ করে ধোঁওয়া ছাড়ার। কেউ কেউ হয়তো Boxing Ring বা Pandiya-র দিকেও চক্কর কাটত। তবে এদের মধ্যে অনেকেই কোনো পাড়াতুতো বোনের সাথে দেখা করতে যেতো, যাদের অনেকেরই সম্পর্ক কলেজ ছেড়েও টিকে গেছে। আর অনেকে ছিল স্বাত্তিক বা ওই রসে বঞ্চিত। সেই সব বঞ্চিতের দল মিলে খুব পিছনে লাগতাম এদের, অসময়ে হাজির হয়ে যেতাম এল স্কোয়ার বা লাভার্স লেনে অথবা নেতাজি ভবনের স্টেডিয়ামে অথবা বক্সিং রিং-এর আশেপাশে। এইসব জনগণ হোস্টেলে ফিরে এলে তাদের বোর করাও হতো, যতক্ষণ না স্বীকার করে।  জানতে চাওয়া হত পান্ডিয়াতে আজ মেনু কি?

কারণ একটা গল্প চালু ছিল কোনো একবার নাকি কোনো I.D.-তে পান্ডিয়াতে নাকি ডিমের ডেভিল হয়েছিল। আর যারা ছিল না তাদের জন্যে মেট্রন ব্যবস্থ্যা করে দিয়েছিলেন যাতে ফিরে এসে তারা তরুনদার কেবিনে (বসন্ত কেবিন) তাদের প্রাপ্য ডেভিল কোনো এক বিকেলের টিফিনে খেতে পারে। সাধারনত সব হোস্টেল বা হলে I.D.-তে হতো মুরগি বা খাসির মাংস। কারু সুবাদে গল্প রটে গেল  পান্ডিয়াতে মাসিক মেস ফি এতো কম হবার কারণ, ওরা I.D.-টে হাফ ডিম খায়। ঘটনাটা কবে হয়েছিল কেউ জানে না, কিন্তু যে কোনো সহপাঠিনীকে একটু "হেটা" (মানে পিছনে লাগা) করতে এটা একটা চালু গল্প।

অনেককে আবার শোনানো হতো সেই পুরনো জোকস। একটা হীরের আংটি ঘিরে দাড়িয়ে আছে চারজন নারী। যুবোরানী ডায়না, ডায়না ওয়াকার (অরণ্যদেবের পত্নী), বি ই কলেজের এক সুন্দরী ছাত্রী এবং অপ্সরা উর্বশী। আংটিটি কে পাবে? উত্তর ছিল যুবোরানী ডায়না, কারণ ১৯৯৭-এর আগে যুবোরানী ডায়না বেঁচে ছিলেন, তাই তিনিই একমাত্র জীবিত চরিত্র, বাকি সবাই কাল্পনিক। আসল বক্তব্য ছিল বি ই কলেজে কোনো সুন্দরী মেয়ে পড়ে না। ঘটনাটা সত্যি নিশ্চই নয়। হলে এত ছেলে কলেজের সহপাঠিনী বা জুনিয়রদের উপর "ফ্রাস্টু খেত" (মানে ভালো লাগা) না। আসলে কিছুদিন পিছনে ঘুরেও লাভ না হলে বা কোনো প্রেম কেটে গেলে এসব বলে একটু মনের জ্বালা মেটানো। মানে ওই আঙ্গুর ফল টক। আর তাছাড়া অন্য একটা উপায় তো মানুষ নিয়ে থাকে, তা হলো মনে মনে বা নিকট বন্ধুদের কাছে  যার উপড় খার তার, তার পিতামাতা, উর্ধস্তন চতুর্দশ পুরুষের গুষ্টির ষষ্ঠিপূজা করা।

তবে আবার একটা গল্প চালু ছিল। গল্প নয় সত্যি ঘটনা। আমাদের আসার অনেক আগেই হয়েছিল যার জীবনে তিনি কলেজের তখন (এখনও) এক প্রফেসর। তাই নাম না বলাই ভালো। মুচিপাড়া থেকে কলেজ আসতে গেলে ওভাল আর উল্ফেনডেন হলের মাঝে একটা ভগ্নপ্রায় বাড়ি ছিল যেটা এখন নতুন করে সারাই হয়েছে। ওটাকে অনেকে মাইকেল মধুসুদনের বাড়ি বলেই জানে। আমাদের কাহিনীর নায়ক তখন বি ই কলেজের ছাত্র, মুচিপাড়ার এক হোস্টেলে থাকে আর নায়িকা তখন মডেল স্কুলের ছাত্রী। অনেকদিন ইস্কুল ছুটির সময় নায়ক খালি হাতে, নোটবুক হাতে বা কোনো ফুল হাতে দাড়িয়ে থাকত, সুযোগ খুঁজত কবে সেই দিন আসবে যখন সেই ফুল নায়িকার হাতে দিয়ে বলবে "প্রিয়ে, তুমি আমার ভাঙ্গা দাওয়ায় স্বর্ণচাঁপা রাজেন্দ্রাণী" বা গাইবে "এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায় স্বপ্ন মধুর মোহে"। নায়িকাটির মনে কি হতো জানা না গেলেও যাবার পথে একটু হাসি উপহার দিত বা বান্ধবীদের নজর এড়িয়ে একটু পিছন ফিরে তাকাতো নায়কের দিকে, যেটাকে কলেজের ভাষায় বলা হত "ঝাড়ি মারা"। একদিন এক বর্ষার দিনে নায়ক দাড়িয়ে আছে; নায়িকার স্কুল ছুটি হয়েছে; সবার এক ড্রেস আর মাথায় ছাতা; নায়ক "ঘেঁটে গেছে" (মানে confused); বুঝতে পারছে না কে সেই নায়িকা আর কে তার কোনো বান্ধবী; বিচলিত হয়ে  শ্যাওলা ধরা সিড়িতে উপড় নিচে করতে গিয়ে পা পিছলে দড়াম; বেশ ভালো চোট পেয়েছিল আর তার সাথে হাত ভেঙ্গে আমাদের সেই বিখ্যাত হসপিটালে ভর্তি হতে হয়। নায়িকা হয়ত সেদিন স্কুলেই আসেনি বা এলেও এসব দেখেও স্লো মোশনে দৌড়ে আসেনি আর পিছনে একশটা ভাওলিন বাজে নি। বন্ধুরাই নায়ককে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে, হাতে প্লাস্টার করিয়ে হসপিটালে ভর্তি করে এসেছিল। আর উপদেশ দিয়েছিল এরপর থেকে আলুর দোষটা ত্যাগ করার। নায়কও ভগ্নমনে তাই মেনে নিয়েছিল। এই কাহিনীর এখানেই শেষ হত বা হওয়া উচিত ছিল। 

কিন্তু কহানী মে টুইস্ট থা। তিন-চার দিন পরে সেই নায়িকা এক সিঁদুররাঙ্গা মেঘের পড়ন্ত বিকেলে টিউশন পড়তে যাওয়ার ফাঁকে একগোছা ফুল নিয়ে দেখা করতে এসেছিল। তারপর লাভার্স লেনে শরতের কাশফুল, শীতের দুপুরে বি গার্ডেনের গঙ্গার পাড়, ফুল না ফোটা বসন্তে বক্সিং রিং পেরিয়ে সেই নায়িকা আজ সেই নায়কের ঘরণী। 

এসব ছাড়াও অনেক নতুন নতুন জিনিস বা চরিত্র হুরমুর করে এসে হাজির হত আমাদের জীবনে, চিরন্তন দাবি মেনে। যারা সাহেবপাড়ায় থাকতাম, মানে হোস্টেল ১৪, ১৫ আর ১৬, তাদের কাছে বাইরের জগতের সোজা রাস্তা ছিল ফার্স্ট গেট। আর যারা আসত হোস্টেল ৭, , , ১০ আর ১১ তে, তাদের কাছে সেকেন্ড গেট। আর একটা ছিল থার্ড গেট, যেটা দিয়ে যাওয়া যেত গঙ্গার ঘাটে, বি গার্ডেনে বা মেইন বাস ডিপোতে। ১৯৯৩ সালে হাতের কাছে মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেট তখন অনেকটা জুলে ভার্নের গল্পের মত। ১৯৮৫ তে ভারত সরকার টেলিগ্রাফ আর পোষ্টালকে আলাদা করে দিলেও শ্যাম পিত্রোদার টেলিকম বিপ্লব তখনও ঘটেনি। তাই দিনের বেলায় হাওড়া থেকে বর্ধমান ফোন করতে প্রায় মিনিটে ত্রিশ টাকা লাগতো, সন্ধ্যে ৭ টার পর সেটা একটু কমতো, ৮টার পর অর্ধেক হতো আর নটা বা দশটার পর এক চাতুর্তাংশ হতো। তাই ওই সময় টেলিফোন বুথের সামনে লাইন লেগে যেত আর ফোন পাওয়া মানে হাতে স্বর্গ পাওয়া।

সব হোস্টেলের প্রত্যেক তলায় একটা করে ক্যান্টিন থাকত। বিভিন্ন মেস কর্মচারীরাই ভাগাভাগি করে সেগুলো চালাত সকাল আর সন্ধ্যে বেলায়। এছাড়াও ছিল ফার্স্ট গেটে তরুনদার বসন্ত কেবিন, ভাবীর পুরী, অর্ন্নপূর্না মিষ্টান্ন ভান্ডার, সেকেন্ড গেটের কাছে জ্যাঠামশাই মিষ্টান্ন ভান্ডার বা কোলে মার্কেটের ছেঁড়া পরোঠা। আর কখনো মেস বন্ধ থাকলে ফার্স্ট গেট থেকে ব্যাতাইতলার দিকে সস্তায় পুষ্টিকর শ্যামদার হোটেল। ব্যাতাইতলা রেলগেট পেরিয়ে গেলে দাসুদার গার্ডেন বার, তার চেহারা আর মেনু ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত্য একই রকম জঘন্য কিন্তূ সস্তা বলে বি ই কলেজের জনতার কাছে বেশ জনপ্রিয়। কিছু হুজুগে জনতা চলে যেতে মন্দিরতলা পরোটা আর গোমাংসের কাবাবের স্বাদ নেবার জন্যে অথবা আন্দুল রোডে কলেজঘাট বা গেস্টকিনের গেটের কাছে সর্দারজির ধাবাতে। আর ছিল কলে মার্কেট ঢোকার মুখে ভাবীজির গঞ্জিকার দোকান। আরো কিছু ছিলো এই রকম জায়গা, কিন্তূ সঙ্গত কারণেই না লেখাই ভালো, যেটা লিখলাম সেটা অনেকদিন উঠে গেছে আর সেখানে একটা ফ্লাটবাড়ি হয়েছে। একটা চিপ স্টোর ছিল I. Hall-এর গায়ে সব বই খাতা ইত্যাদির জন্যে, যেটাকে আমরা চিট স্টোর বলতাম। স্টোরের মালিক ছিল দেবেন্দ্রনাথ জানা, সেটাকে নিয়ে মজা করে বলা হত "দেবেন জানা, উনি কি দেবেন জানা আছে"। আর ছিল আমাদের কলেজ ক্যান্টিন বা খুরশিদদার ক্যান্টিন। আমাদের ক্লাস কেটে আড্ডা মারা, টেবিল চাপড়ে বেসুরো গান করা, মাঝে মাঝে সিনিয়ারদের কাছে Rag হওয়া, Sessional-এর শেষ কাজ, রাত জেগে I. Hall সাজানো থেকে আজও কলেজে গিয়ে যখন খুশি, যেখানে খুশি, যেভাবে খুশি বসার জায়গা। আর সেই বকুলতলা, সেটার গল্প অন্য এক অধ্যায়ে।

আর একটা কথা না বললে প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। Ragging Period শেষ তারপর হত সব ডিপার্টমেন্টের Freshers' Welcome, তাতে অল্প করে সিনিয়াররা জুনিয়ারদের একটু বোর করতো। নতুনদের স্টেজে তুলে তাৎক্ষনিক বক্তৃতা দিতে বলা হত অদ্ভুত কিছু টপিক দিয়ে এসবের কিছু পরে সব হোস্টেলের সব ফ্লোরে একটা করে পিকনিক হত, সেটা হলো ফ্লোর ফিস্ট। সেই ফ্লোরের সব সিনিয়ার যারা বিভিন্ন হলে চলে গেছে তাদেরকেও নেমন্তন্ন করে আনা হত। তাতে বেশ মাস্তি হত, আলাপ পরিচয় হত, খাওয়া দাওয়া হত আর হত নামকরণ। একে একে সব ফার্স্ট ইয়ারকে একটা টেবিলে উঠে পিছন ফিরে দাঁড়াতে হত, সিনিয়াররা সর্বসম্মতিক্রমে তার একটা নাম দিত, যারা স্বীকার করত তাদের বোন আছে তাদের মধ্যে কেউ হত শালা, কেউ নাটুকে ঢঙে কথা বলে তাই নটসূর্য বা নসু, কেউ পাখি, কারো বাড়ি ভোগপুর বলে তার নাম ভোগপুর, কেউ রোগা বলে খেঁচি, কেউ লম্বা হলে লগা, কেউ ল্যামির মত দেখতে বলে আইসটোপ বা আইসো, আবার কোনো কারণ ছাড়াই কুত্তা, লাগু, হাগু, ভগা, চু, কাকু, মৃত, কালী, তিগু, বেচু, বগা, ছাগল, ভেড়া, মামা, কাকা, সেক্সি, বৌদি ইত্যাদি। যার নামকরণ হলো তাকে পিছন ফিরে দাড়িয়ে দুপায়ের ফাঁক দিয়ে মাথা গলিয়ে একটি বিশেষ অঙ্গ চেপে ধরে বলতে হত, "আমি অমুক নাথ তমুক, আজ হইতে আমি আমার পৃতিদত্ত নাম পরিত্যাগ করিয়া ছাগল নামে পরিচিত হইলাম"। ঘোষনা শেষ হলেই সবাই মিলে সমস্বরে হুস হুস করে উঠলেই তাকে টেবিল থেকে লাফিয়ে চলে যেতে হতো। বেশ অভিনব ছিল ব্যাপারটা।